বাংলাদেশ মঙ্গলবার 21, May 2019 - ৭, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বাংলা


‘ছবি আঁকলে চাকরি হবে না, বউ পাবা না’

০৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২১:৪০:৩৩

বিডিটিনিউজ ডেস্ক:

চিত্রশিল্পী মারুফ আহমেদ। শেকড় যার বাংলাদেশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। রেডিও, টিভির সংবাদ পাঠকও ছিলেন। এরপর উচ্চশিক্ষা আর জীবিকার তাগিদে স্বাধীনতার পরপর পাড়ি জমান জার্মানিতে। সেখানে মাস্টার্স এবং পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এরপর শিল্পকর্ম আর পারিবারিক বন্ধনের কারণে তিনি জার্মানিতেই স্থায়ী বসতি গড়েন।

অবশ্য নাড়ির টানে প্রায়শই বাংলাদেশে আসেন, থাকেন। দীর্ঘদিন জার্মানির বাসিন্দা হলেও তার চিত্রকর্মে বাংলাদেশের রূপ, ঋতুর প্রভাব দৃশ্যমান, মূর্ত না হলেও আবেগের বিমূর্ততায় থেকে যায়। ক্যানভাস আর রঙের গুণী মানুষ জার্মান প্রবাসী চিত্রশিল্পী মারুফ আহমেদ নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন পাঠকদের জন্য। 

শরতের শুভেচ্ছা।

মারুফ আহমেদ: শুভেচ্ছা নেবেন। 

 চিত্রশিল্পী হিসেবে আপনার প্রস্তুতি চর্চা অনেক দিনের। শুরু করেছিলেন কিভাবে, কখন?

মারুফ আহমেদ: ছোটবেলা স্কুল জীবনে সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনে পদচারণার সাথে চিত্রাঙ্কনের প্রতিও ছিল গভীর অনুরাগ। চরিত্রাভিনেতা প্রয়াত ইনাম আহমেদের ছেলে হওয়ার সুবাদে পাঁচ বছর বয়সেই রেডিও-তে শিশু অভিনেতা হিসেবে আমার হাতে খড়ি। বাবার কারণেই আমার আর্ট কলেজে যাওয়া হয়েছিল। তখনও বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। সেসময় শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়াটা খুব কঠিন ছিল। চাকরি হবে না বউ পাবে না, এমন কত কথা শুনতে হতো তখন। তবে বাবা নিজে শিল্পী হওয়ার কারণেই আর্ট কলেজের সঙ্গে জড়িত হতে পেরেছিলাম। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে আর্ট কলেজে চিত্রাঙ্কনে অধ্যাপনার সুযোগ পাই। তারপর তো অনেক কিছুই হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলাম। সেই থেকেই শুরু হয় চিত্রকলার চিত্রশিল্পী হিসেবে আমার প্রস্তুতি এবং চর্চা। ১৯৬৭ সাল থেকেই শুরু হয় আমার চিত্রাঙ্কনের চর্চা, শিল্পকলার দিকে এগিয়ে যাওয়া। এর পর থেকেই আর কোনো বাধা বিপত্তিকে মানতে পারিনি। 

চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু কিভাবে নির্ধারণ করেন? আপনার কাজে কোনো দর্শনের প্রতিফলন বা প্রভাব দেখাতে চেষ্টা করেন?

মারুফ আহমেদ: আমার চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু সবসময়ই নির্ধারিত হয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আমার পারিপার্শ্বিকতা, আমার চিন্তাধারা বা কোন কিছুকে আমি যদি কখনো দেখি বা কখনো মাথায় আসে সেভাবেই আমি সেটাকে মোটামুটি একটা দিক দেখাতে চাই। সেখানে মানুষের চিন্তাধারা, মানুষ কিভাবে ঘোরাফেরা করছে এবং প্রকৃতির ব্যাপারটাও একটা বিরাট ভূমিকা পালন করে। সেই হিসেবে কোনো একটা নির্দিষ্ট কিছু আমার চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু নয়। তবে আমার চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু মূলতই..... অনেক বিদেশি সমালোচক আমার ছবিকে বলেছেন “কবিত্বময় প্রকাশ পাঠ” সেটা আমি নিজে অতোটা জানি না, তবে তারা এভাবে দেখছেন সেটাতেই আমি খুশি।

না, আমার ছবিতে কোনো দর্শনের প্রতিফলন বা কোনো একটা বাণীর উদ্দেশ্য আমার নেই। আমার ছবিতে রঙের প্রভাব প্রচুর এবং একটা জিনিসই আছে আমার চিত্র কলায়, মানুষ শুধু দুঃখ দারিদ্র সেটাকেই খুঁজে পাবে এমন কোনো কথা নেই। না, একটা দর্শন বা একটা বাণী আমি দেখাতে চাই না। এটা সবার জন্য যেন আনন্দমুখর হয় বা দেখার কিছু হয়, যেখানে প্রচুর ফিগার রয়েছে বিভিন্ন ধরনের। আমার ছবি নিরবস্তুক হলেও আমার ক্যানভাসে প্রচুর বাস্তবিক ফিগার রয়েছে। 

: ছবি আঁকার জন্য আপনার প্রিয় সময় কোনটা?

মারুফ আহমেদ: ছবি আকার জন্য আমার প্রিয় সময় প্রায় সবসময়ই। তবে বেশিরভাগ সময়ই আমার দিনের আলোতে ছবি দেখার ইচ্ছা। অনেক কিছু ভাবি, অনেক কিছু চিন্তা করি কিন্তু অনেক সময় ছবি আঁকতে আঁকতে অনেক সময় গড়িয়ে যায় তখন গভীর রাত অব্দি ছবি আঁকি মাঝে মধ্যে। তবে শুরু করি আমি দিনের আলোতে। 

একবসায় আঁকেন, না কেটে-ছিঁড়ে সময় নিয়ে করে থাকেন?

মারুফ আহমেদ: না একবারে একটা ছবি আঁকা হয় না। অনেক সময় থেকে থেকে করতে হয়, কখনও বা দুদিন তিনদিন সময় লেগে যায়। আমার যে প্রসেস আছে খুব মোটা রঙের ব্যবহার, এতে করে মাঝে মধ্যে রঙ শুকাতে অপেক্ষা করতে হয়। একটা ছবি করতে মাঝে মাঝে তিনদিনও লাগে আবার তিন মাসও সময় লেগে যায়। এটা ডিপেন্ড করে কি ধরনের কত বড় ছবি। কারণ আমার মোটা রঙের কাজের সময় বিভিন্ন প্রলেপের উপর প্রলেপ দিয়ে ছবি আঁকা। সো তাতে করে সময়টা আমার অনেক লেগে যায়। কিন্তু মোটামুটি ধারণাটা আমার মাথায় থেকে যায় যে আমি কি চাই এবং কিভাবে সেটা করতে হবে। 

পরিবর্তন ডটকম: আপনার সবচেয়ে আলোচিত চিত্রকর্ম সম্পর্কে কিছু বলুন-

: আমার একটি নির্দিষ্ট শিল্পকর্ম বা চিত্রকর্ম নেই যা বহুল আলোচিত হয়েছে। আমার প্রায় বহু ছবি বহুল আলোচিত হয়েছে যা মানুষ পছন্দ করেছে। বড় বড় কোম্পানি বা রেসেপশন হল বা মিটিং হলে বড় বড় ছবি ঝোলালে সাধারণ মানুষও তার ঘরের জন্য ছোট্ট একটা ছবি কিনেছে। সেটাই আমার বড় স্বীকৃতি। জার্মানির বহু বড় বড় শহরে আমার ছবি রয়েছে। এটাই আমার বড় গর্ব। আমি খুব নামি দামি শিল্পী হইনি তবে আমি প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি সেটাই বড় জিনিস। 

: পেইন্টিংয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃতির কোনো উপাদানটি আপনাকে চমৎকৃত করে, ভাবায়?

মারুফ আহমেদ: প্রকৃতির একটা নির্দিষ্ট উপাদান সম্পর্কে বলতে যাওয়াই বিরাট ব্যাপার। প্রকৃতির যে বিভিন্ন দিক রয়েছে- সৌন্দর্য, দানবিক, নৃত্যকর্ম, মাঝে মাঝে প্রকৃতি যে কতোটা উত্তাল হতে পারে, কতোটা নিখুঁত...... প্রকৃতির এইসব দিকগুলোই আমাকে অত্যন্ত রকম বিচলিত করে। প্রকৃতিকে আমরা নষ্ট করে ফেলেছি। প্রকৃতি হয়তো-বা আমাদের উপরই খেপে গেছে, কারণ প্রকৃতির বিরুদ্ধে আমরা খুব অন্যায় কাজ করেছি। যা-ই হোক আমি পলিটিক্যাল কিছু বলতে চাই না। প্রকৃতি আমার ছবিতে একটা বড় ভূমিকা পালন করে। 

: আপনার জন্মস্থান বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ইউরোপে আপনার কাজে লাগে?

মারুফ আহমেদ: আমার উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার বা উজ্জ্বল রঙের প্রভাবটা কিন্তু এসেছে বাংলাদেশ থেকে। 

বাংলাদেশ ছেড়ে জার্মানিতে গেলেন কেন?

মারুফ আহমেদ: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ রেডিও ও টেলিভিশনে তখন আমি খবর পাঠক ছিলাম। সেই সুবাদে জার্মানির কিছু সাংবাদিকের সাথে আমার পরিচয় হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা বিশ্বের অনেক সাংবাদিক ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। আমি সংবাদ দাতাদের সাথে কিছু করেছিলাম আন্তর্জাতিক লেখকদের জন্য। তারা একবার বৃত্তি দিয়েছিলো শিল্পীদের জন্য, সেটা আমি পেয়েছিলাম। সেটা ছিল ১৯৭৬ সালে। তারপর জার্মানিতে আসার পরে একটা বৃত্তি নিয়ে শিল্পকলার উপর আমি মাস্টার্স এবং পিএইচডি করি। অবশ্য জার্মানি সম্পর্কে বরাবরই আমার একটা উৎসাহ ছিল। খুব একটা কিছু জানতাম না। প্যারিস, নিউইয়র্ক তো সবারই পরিচিত, জার্মানি পরিচিত ছিল না। সেটাও একটা কারণ ছিল, কেন আমি জার্মানিতে এলাম। এর আগে আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধ করার পর ১৯৭৩ সালে ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিতে অভিনয় করেছি। ব্রিটিশ হাইকমিশনে কাজ করেছি। অনেক কিছুই করেছি। তারপর যখন বৃত্তিটা পেলাম তখন আমার উৎসাহটা আরও বেশি বেড়ে গেলো এবং সেজন্যই আমি জার্মানিতে এসেছি।  

 জার্মানিতে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত কবে এবং কেন নিয়েছিলেন?

মারুফ আহমেদ: শিল্পকর্মের চর্চার পাশাপাশি পরিবার রয়েছে। স্ত্রী, দুই সন্তানের বাবা। তারা এখন বড় হয়েছে। তারপরে স্বভাবতই এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য অত্যন্ত গর্বিত। আমার একটা সুখী পরিবার রয়েছে। অতএব এখন এখানেই থাকব। 

আপনার পরবর্তী ভাবনা সম্পর্কে যদি বলেন–

মারুফ আহমেদ: আমার পরবর্তী ভাবনা অনেক কিছুই আছে, তবে বর্তমানে আমি একটা কাজ করছি, আর্ট প্রোজেক্ট করছি কিশোর-কিশোরী আর তরুণ-তরুণীদের নিয়ে। যাদের কিছুটা বাধা বিপত্তি রয়েছে অর্থাৎ যারা এখানে আশ্রয় নিয়েছে, যাদের স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেই তাদের সহায়তা করার জন্য এই প্রোজেক্ট করছি শিল্পকলার মাধ্যমে। সেটার জন্য ফাইনান্সিয়াল এবং সবধরনের সাপোর্ট পাচ্ছি কালচারাল ডিপার্টমেন্ট থেকে। এটা ভবিষ্যতে আরও বড় করে করার চেষ্টা করছি। 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন


এ সম্পর্কিত খবর

ময়মনসিংহে নির্জন খালের পাড় থেকে দুই মৃত নবজাতক উদ্ধার

ময়মনসিংহে নির্জন খালের পাড় থেকে দুই মৃত নবজাতক উদ্ধার

ময়মনসিংহের নান্দাইলে দুটি মৃত নবজাতক উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার বিকেলে নবজাতক দুটি উদ্ধার করে মর্গে

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান কিনতে বলেছে সংসদীয় কমিটি

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান কিনতে বলেছে সংসদীয় কমিটি

সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা দেড় লাখ টন ধানের চেয়ে আরও বেশি ধান কেনার সুপারিশ করেছে সংসদীয়

ফুলবাড়ীতে বোরো ধান চাউল ও গম সংগ্রহের উদ্বোধন

ফুলবাড়ীতে বোরো ধান চাউল ও গম সংগ্রহের উদ্বোধন

ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি অভ্যন্তরীন বোরো ধান,গম ও চাউল সংগ্রহের উদ্বোধন করা হয়েছে।


মুসলিমদের জন্য ইফতারের আয়োজন অযোধ্যার মন্দিরে

মুসলিমদের জন্য ইফতারের আয়োজন অযোধ্যার মন্দিরে

পবিত্র রমজান মাসে সম্প্রীতির বন্ধন বাড়াতে মন্দিরে ইফতারের আয়োজন করেছে অযোধ্যাবাসী। তবে এতে কোন রাজনৈতিক

ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের আন্দোলন স্থগিত

ছাত্রলীগের পদবঞ্চিতদের আন্দোলন স্থগিত

ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা দীর্ঘ ২২ ঘণ্টা পর তাদের আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। রোববার (১৯ মে)

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির প্রার্থী রুমিন ফারহানা

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির প্রার্থী রুমিন ফারহানা

একাদশ সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দলের সহআন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।


ইসলাম ধর্মকে অবমাননাকারী সেই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার

ইসলাম ধর্মকে অবমাননাকারী সেই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার

ফেসবুকে ইসলাম ও হযরত মোহাম্মদ (স) নিয়ে কটুক্তির অভিযোগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার

কুড়িগ্রামে ইউএনও কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে টাকা ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভ   

কুড়িগ্রামে ইউএনও কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে টাকা ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভ   

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস পার হলেও মাসে মাসে জমা করা

মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা উধাও

ফুলবাড়ীতে ভিজিডি’র সঞ্চয়ের দেড় কোটি টাকা গায়েব

ফুলবাড়ীতে ভিজিডি’র সঞ্চয়ের দেড় কোটি টাকা গায়েব

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা.মাছুমা আরেফিন টাকা উত্তোলনে জন্য স্বাক্ষর করেছেন মনে নেই, দেখতে





ব্রেকিং নিউজ